সাক্ষাৎকার : যারা দেশের শাসক তারা পুঁজিবাদে দীক্ষিত এবং তারাই শোষণ করছে- সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

সাক্ষাৎকার: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ০২ অক্টোবর ২০১৬, ০৬:২৬ অপরাহ্ন
inteview-sic-1st-part

( অধ্যাপক সিরজুল ইসলাম চৌধুরীর এই সাক্ষাৎকারটি ত্রৈমাসিক পোস্টকার্ডের বইমেলা ২০১৫ সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। সাক্ষাৎকারটির বৃহৎ পরিসর বিবেচনায় নিয়ে এটি একবারে প্রকাশ না করে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হবে। বর্তমানে এর প্রথম পর্ব প্রকাশ করা হলো- সম্পাদক postcardnews24.com)
 
পোস্টকার্ডঃ   সংস্কৃতি-র সার কথা হলো- কোন নির্দিষ্ট অঞ্চলের নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠীর আচার ব্যবহার, চাল- চলন, রীতিনীতি, পোশাক-পরিচ্ছদ, যুক্তি-অযুক্তি, বিশ্বাস-অবিশ্বাস সবই অর্থাৎ তার সামগ্রিক জীবনযাপন। কিন্তু আপনার বইয়ের ‘কবি এবং প্রতিনিধি  সংস্কৃতির’ ও ‘সংস্কৃতি ও স্বাধীনতা’ প্রবন্ধে আপনি বলেছেন ‘সংস্কৃতির প্রধান কথাটা হচ্ছে সৃজনশীলতা’ – সেটি কোন অর্থে?  
 
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীঃ    আমি  যেটা বলেছিলাম যে, সংস্কৃতির একটা বিবরণ দিতে পারব আমরা । অনেক উপাদান আছে । কিন্তু সংস্কৃতি সবসময়ই সৃজনশীল মানে এই যে উপাদান গুলোর কথা আমরা বলবো, এগুলোর সমস্ত কিছুর মধ্যেই একটা সৃষ্টিশীলতা  আছে। অর্থাৎ এইটা কোনও স্তব্ধ বিষয় না, যেখানে আমি বোঝাতে চেয়েছি যে যদি একটা স্তব্ধতা আসে তাহলে একটা পুকুর যেমন ডোবায় পরিণত হয় সংস্কৃতিও ওই রকম ডোবায় পরিণত হবে যদি এর প্রবহমানতা না থাকে । আমি সৃজনশীলতা কথাটাকে প্রবহমানতার অর্থে বোঝাতে চেয়েছি।
 
পোস্টকার্ড - মানে গতিময়তা ?
 
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীঃ    হ্যা । গতিময়তা থাকতে হবে।   এবং সংস্কৃতি  সবসময় এগুতে থাকবে, পরিবর্তিত হতে থাকবে অর্থাৎ একজায়গায় থাকবে না। একজায়গায় থাকলে তো সে বদ্ধ হয়ে যাবে। আমি ওটাই বোঝাতে চেয়েছি । 
 
পোস্টকার্ডঃ   উপনিবেশিক সময়কালে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রগুলো দখলকৃত রাষ্ট্রগুলোতে শোষন লুন্ঠন চালানোর জন্য একটা প্রচার সামনে এনেছিল, তা ছিল ঐ রাষ্ট্র সমুহের সংস্কৃতি তথা জীবনযাত্রার  মান, চিন্তাচেতনা ও দর্শন নিজেদের থেকে অত্যন্ত নিচুমানের। অর্থাৎ নিজেদের সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ‘শ্রেষ্ঠত্বের দাবী’। এমন কি আজকের কালে সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রগুলোর ক্ষেত্রে লুন্ঠন প্রক্রিয়ার অধিকতর বিকশিত রূপ হিসেবে আমরা যা দেখি তা হচ্ছে দেশে দেশে হত্যাযজ্ঞ - সম্পদ লুঠ -অধিগ্রহন - যুদ্ধ-বিগ্রহ -অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা- নিয়ন্ত্রণ। সেক্ষেত্রেও আমরা সেই একই বিষয় দেখি অর্থাৎ উৎকৃষ্ট-নিকৃষ্টের, গণতান্ত্রিক-অগণতান্ত্রিক, মানবিকতা-অমানবিকতা, গণতন্ত্র-একনায়কতন্ত্র এই সূত্রায়ণে  নিজেদের সাংস্কৃতিক শ্রেষ্ঠত্বের দাবী । যার সামগ্রিক একটা ব্যাখ্যা আপনি করেছেন “বাংলাদেশের রাজনীতি : কয়েকটি বিশ্লেষণ” প্রবন্ধে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে এর বিপরীতে প্রতিরোধের সাংস্কৃতিক পথ কোনটি? 
 
সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীঃ   আসলে যে কথাগুলো এখানে বললে,   সুন্দর ভাবেই বর্ণনা করলে পরিস্হিতিটা। এটি হচ্ছে যে যারা দখল করে নেয় তারা আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে চায় এবং সেই প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে একটা হীনমন্যতা তৈরি করে এই যে, তোমরা নানা দিক থেকে হীন। বর্ণে, ভাষায়, ধর্মে, নানান ভাবে হীন এবং তারা যে জিনিসটা করে প্রথমত তারা ভাষাটাকে চাপিয়ে দেয়। কেননা ধর্মের চাইতেও ভাষা বেশি শক্তিশালী। যেমন ধরো রবিনসন ক্রুসো উপন্যাসে দেখব যে একটা উপনিবেশবাদ কিভাবে বিস্তার করে তার একটা মডেল আছে। সেটা হলো যে, রবিনসন যখন একজন স্হানীয় লোককে পেল তখন তার নাম দিয়েছে ফ্রাইডে। অর্থাৎ তাকে একেবারেই ইংরেজ বানিয়ে ফেলছে, তাকে কিন্তু রবিনসন তার নিজের সংস্কৃতির মধ্যে নিয়ে আসছে। তার নিজস্ব নাম আর থাকছে না এবং তাকে ভাষা শেখাচ্ছে। আবার ওর সাথে একটা তোতা পাখি ছিল সেইটেকেও রবিনসন তার ভাষা শিখিয়েছে, নিজের ভাষা। তো উপনিবেশের প্রথম শক্তিটাই হচ্ছে ভাষার উপর আধিপত্য। তারপরে ঐ ছেলে, ফ্রাইডেকে খ্রিস্টান করার ব্যাপারে তার আগ্রহ নাই, সে জীবনযাপনের মধ্যে খ্রিস্টান হয়ে যাচ্ছে, ওদের ধর্মে-আচরণে। কিন্তু ধর্মও সেখানে গুরুত্বপূর্ণ না।
 
আমরা ভারতবর্ষের ইতিহাসেও দেখব যে এখানে যারা আধিপত্য, উপনিবেশ স্হাপন করেছে তারা কিন্তু ধর্ম প্রচার করতে চায় নি এবং এমনকি যারা মিশনারি এসেছিল ওদের সাথে, সেই মিশনারিরা ভরতে ধর্ম প্রচার করল কারণ খ্রিস্টান ধর্মে  দীক্ষিত  করতে পারলে ওই উপনিবেশের সুবিধা হবে। কিন্তু যারা বুদ্ধিমান কোম্পানির লোকজন তারা দেখেছে, এবং পরে যখন সরাসরি ইংরেজের শাসন হলো তারা দেখলো যে ধর্মের ওখানে আঘাত দিলে মানুষ প্রতিরোধ করবে, মানুষের ধর্মটা খুব একটা বিশ্বাসের ব্যাপার এবং তার ব্যক্তিগত সম্পত্তির মতন, সেটাকে যে কেড়ে নিতে চাইবে তখন সে বাধা দিবে, কিন্তু যদি ভাষা শেখানো হয় তবে সে আস্তে আস্তে তার অধীনে চলে আসবে। সেজন্যই যখন এখানে কেরি এসেছেন, উইলিয়াম কেরি । উনি তো ধর্ম প্রচারক হিসেবে এসেছিলেন। কিন্তু উইলিয়াম কেরিকে পরে নিরুৎসাহিত করা হলো মানে কোম্পানি ওকে নিরুৎসাহিত করলো। পরে দেখা গেল  ১৮০১ সালে যখন ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ হলো, সেই কলেজে তাকে শিক্ষক করে দিল, ইংরেজদের বাংলা শেখানোর জন্য। শুধু কেবল বাংলাই নয়, হিন্দিও শিখবে। তারা এই ভাষা শিখবে কেন? শিখবে এই কারণে যে স্হানীয় লোকদের সাথে যোগাযোগ করার জন্য এবং স্হানীয় লোকদের অধীনে রাখার জন্য। তো এইটা হচ্ছে একটা দিক। আরেকটি বড় দিক হলো যে প্রথমে তো এখানে  ফার্সি ভাষা ছিল। আমরা যদি বাংলার কথা বলি, ফার্সিই ছিল ইংরেজের এর আগে এখানকার রাষ্ট্র ভাষা, সেটি ইংরেজি হয়ে গেল। মানে স্থানীয় লোকেরাও ইংরেজি শিখছে, যেহেতু কোম্পানির সাথে যোগাযোগ করতে হবে। কিন্তু কোম্পানি নিজেই ১৮৩৭ সালে একেবারে আনুষ্ঠানিকভাবেই ইংরেজির মাধ্যমে শিক্ষার ব্যবস্থা চালু করল। তো উইলিয়াম কেরিও ততদিনে বাংলা ভাষার চর্চা করছে, বাংলা তৈরি করছে এবং তা করছে বাংলাকে শাসন করার সুবিধার জন্য। কাজেই আমরা দেখব যে ভাষার আধিপত্য অনেক বেশি সত্য এবং আরেকটা সত্য যে মানুষ সহজে ধর্মান্তরিত হতে পারে, হয়। কিন্তু ভাষান্তরিত হয় না, ভাষান্তরিত হওয়া খুব কঠিন। ধর্মান্তরিত হওয়ার চাইতে ভাষান্তরিত হওয়া কঠিন। এবং আরবরা যখন ইরান দখল করেছে এবং দখল করে কয়েক’শ বছর ধরে শাসন করেছে তখনো কিন্তু ইরানিরা তাদের ভাষা ছাড়েনি । তাদের ফার্সি ভাষা তারা ধরে রেখেছে এবং অসাধারণ সমস্ত সাহিত্য চর্চা করেছে। তার মানে দেখা যায় যে তাদের মেরুদণ্ডটা শক্ত ছিল। কাজেই এই চর্চাটাও একটা দৃষ্টান্ত যে কিভাবে নিজের স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা যায়। আমাদের ক্ষেত্রেও যেটা ঘটেছে যে আমাদের এখানেও ইংরেজিকে রাষ্ট্র ভাষা করে ফেলল, শিক্ষার মাধ্যম করে ফেলল, কিন্তু আমাদের এখানে যারা সাহিত্য চর্চা করলেন তারা কিন্তু বাংলা ভাষায় চর্চা করলেন এবং বাংলা ভাষাটাকে উন্নত করলেন, বিকশিত করলেন, এটা সাম্রাজ্যবাদ বিরোধিতার একটা দিক, যদিও তাদের অনেকেই সাম্রাজ্যবাদের অনুগত ছিল। রামমোহন, বিদ্যাসাগর, বঙ্কিমচন্দ্র ...। মাইকেল তো ইংরেজ হয়ে যাওয়ারই চেষ্টা করলেন। এঁরা সকলেই কিন্তু  সাম্রাজ্যবাদকে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু এদের বাংলাভাষায় সাহিত্য চর্চার মধ্য দিয়ে ভেতরে ভেতরে আবার এর বিরূদ্ধে একধরণের প্রতিরোধও গড়ে উঠছে। যেমন রামমোহন বাংলাভাষায় তার গদ্যকে বিকশিত করছেন, তিনি হিন্দু শাস্রের অনুবাদ করছেন । এবং বিদ্যাসাগর অনুবাদ করছেন, লিখছেন। বঙ্কিমচন্দ্র উপন্যাস লিখছেন এবং দেখা যাবে যে বঙ্কিমচন্দ্র যখন প্রথম উপন্যাসটা লেখেন ‘Rajmohon’s Wife’  সেটা হচ্ছে ইংরেজি ভাষায় । কিন্তু ইংরেজি ভাষায় লিখে উনি বুঝে ফেলেছেন যে এটা সুবিধের হবে না, এটাতে কাজ হবে না, তখন তিনি অন্য উপন্যাস গুলো বাংলায় লিখলেন। মাইকেলও তো ইংরেজিতে ‘Captive lady’  লিখেছিলেন কিন্তু বুঝেছেন যে তাকে মাতৃভাষার চর্চা করতে হবে। এবং পরে তিনি নিজেকে বলেছেন যে ‘ভিখিরি হিসেবে নানান জায়গায় ঘুরে বেরাচ্ছ কেন, নিজের দেশে ফেরো’। তাই আমরা দেখছি ব্রিটিশ আমলে এই যে মাতৃভাষার চর্চা হচ্ছে বাংলায়, অন্যত্রও হচ্ছে-অন্যরা উর্দু ভাষার চর্চা করছে বা হিন্দির চর্চা করছে, এই চর্চাটা কিন্তু সাংস্কৃতিক আধিপত্যের বিরূদ্ধে একটা প্রতিরোধ এবং সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। সেই প্রতিরোধটাই রাজনৈতিকভাবেও বিকশিত হয়েছে। সাংস্কৃতিকভাবেই এ প্রতিরোধটা আগে তৈরি হয়েছে, রাজনৈতিকভাবে তো তা পরে এলো।
 
রাজনীতির একটা ঘটনা যদিও ১৮৫৭ তে ঘটেছে, বড় ঘটনা, কিন্তু সেটা তো সংঘটিত ছিল না। তো মধ্যবিত্তের রাজনীতির যে চর্চা সেটা পরে এসেছে, কিন্তু আমরা দেখব যে ভাষার প্রতিরোধটা শুরু হয়ে গিয়েছে আগেই। আর এ প্রতিরোধের শক্তির পরীক্ষা হয় এভাবে যে তারা ভাষাটাকে,অর্থাৎ নিজেদের মাতৃভাষাটাকে আধিপত্যের অধীনে কেমন করে বিকশিত করতে পারছে, তারা কেমন করে চর্চা করতে পারছে।
 
আজকের বাংলাদেশে যদি আমরা দেখি, তো  দেখব যে আজকে কিন্তু ওই প্রতিরোধটা নাই, সাংস্কৃতিক ওই প্রতিরোধটা নাই।  আজকে যে উপনিবেশ বলি বা সাম্রাজ্যবাদ বলি তার পেছনে তো আছে পুঁজিবাদ। এখন পুঁজিবাদের এ দুরন্তপনা এমন হয়ে গেছে যে সে আরো সূক্ষ্ম ভাবে চলে। সে আধিপত্য তৈরি করছে সাংস্কৃতিকভাবে। যেমন ধরো- দেশেই এখন তিন ধরনের শিক্ষা চলে এলো। তিন ধরনের শিক্ষা আগেও ছিল কিন্তু এইরকম ভাবে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষাটা এতোটা বিত্তবান শ্রেণীর  মধ্যে এইভাবে প্রবেশ করে নাই কখনও। তাহলে বাংলা সাহিত্যে বঙ্কিমচন্দ্ররা আসতে পারতেন না। বঙ্কিমচন্দ্র তো প্রথম গ্র্যাজুয়েট, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এঁরা কিন্তু দাঁড়াতে পারতেন না, যদি না তাঁরা মাতৃভাষায় সাহিত্য চর্চা করতেন । তাঁরা কিন্তু ইংরেজী ভাষার কাছে আত্মসমর্পণ করেন নাই। আমরা বিশেষত আমাদের শাসক শ্রেণী  পুঁজিবাদের কাছে আত্মসমর্পণ করে ফেলেছে। আবার আমরা কি করলাম, স্বাধীনতা লাভ করার পরেই  আমরা পুঁজিবাদের একটা প্রান্তিক দেশে পরিণত হলাম। আগে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে স্বাধীনতা সংগ্রামটা ছিল এক অর্থে যে ওরা পুঁজিবাদী, ওরা আমাদের সম্পদ লুণ্ঠন করছে, ওরা আমাদেরকে অপমান করছে, ওরা আমাদের অধিকার হরণ করছে, কাজেই আমরা তার বিরুদ্ধে একটা লড়াই করছি। এখন আর  পুঁজিবাদীদের বিরুদ্ধে লড়াইটা  ওই রকম প্রত্যক্ষ ভাবে হচ্ছে না । কেননা যারা দেশের শাসক তারাই তো পুঁজিবাদে দীক্ষিত। তারা সকলেই পুঁজিবাদে বিশ্বাস করে। এবং তারাই শোষণ করছে।  তারাই আমাদের সম্পদ বিদেশে পাচার করছে। এমনকি তারা বাংলাভাষাটাকেও সার্বজনীন করতে পারছে না- একটা কথা। দ্বিতীয় কথা হচ্ছে উচ্চশিক্ষার মাধ্যম করতে পারছে না, এবং তৃতীয়ত তারা উচ্চআদালতে বাংলা ভাষা  চালু করতে পারছে না। এটা তো খুব আশ্চর্যের ব্যাপার যে আদালতে বিচারক, বাদী-বিবাদী, উকিল সকলেই বাঙালি কিন্তু সেখানে উচ্চ আদালতে বাংলায় কাজ হচ্ছে না। কাজে এতেই বোঝা যায় আমাদের যে শাসক শ্রেণী, তারা এখন সাংস্কৃতিক প্রতিরোধটা করবে কি, উল্টো তারা  আত্মসমর্পণ করেছে।
 
এখন আমরা বাংলা সাহিত্যের ক্ষেত্রেও দেখবো পশ্চিম বঙ্গের অনেক মেধাবান ছেলে-মেয়েরা ইংরেজিতে লিখছে এবং তারা একটা বড় বাজার পাচ্ছে। বাজার পাওয়াটা ওদের কাছে খুব জরুরী আর সেজন্য ঐ মেধাবানদের একটা অংশ  ইংরেজিতে চলে যাচ্ছে যেটা কিন্তু ব্রিটিশ আমলে হয় নাই । ব্রিটিশ আমলে সব মেধাবানরাই বাংলায় চর্চা করেছেন। দু’একজন ব্যতিক্রম ছাড়া ইংরেজিতে কেউ লেখে নাই। রবীন্দ্রনাথ যে নোবেল পুরষ্কার পেলেন তা কিন্তু বাংলায়, ইংরেজিতে লিখে নয়। রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি সাহিত্যের কোনও চর্চা করেন নাই, করার কথা ভাবেন নাই। এখন  আমাদের দেশে যেটা হচ্ছে, মেধাবান তরুণদের  একটা অংশ ইংরেজি মাধ্যমে  শিক্ষিত হচ্ছে, তো এই ছেলেমেয়েরা যেহেতু বিত্তবান, এই ছেলেমেয়েরা একটা আন্তর্জাতিক জায়গায় যেতে চায় এবং আন্তর্জাতিক জায়গার বাজারটাও বড়। তো তাদের যে লেখা, নতুন নতুন লেখা সেগুলো হচ্ছে ইংরেজীতে। কেননা বাজার বড় মানে প্রচার বড়; তারা নানান ধরনের পুরষ্কার পাবে বা বিদেশ থেকে পুরষ্কার পেলে তারা সম্মানিত হবে, তারা গৌরবান্বিত হবে, সেজন্য তাদের ইংরেজী ভাষায় সহিত্য চর্চার প্রতি ঝোঁক রয়েছে। এখানেও কিন্তু দেখা যাচ্ছে যে, সাংস্কৃতিক আধিপত্যটা এই সাহিত্যের ক্ষেত্রেও ঢুকে পড়ছে। উর্দুকে যখন আমাদের ওপর চাপিয়ে দেয়া হলো আমরা তাকে প্রতিরোধ করলাম। তার মানে আমরা তখন একটা সংগ্রামী সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ করেছিলাম। এখন ঘরে ঘরে  হিন্দি ঢুকে গেছে এবং হিন্দি বাচ্চারাও শিখছে, বলছে। এর মধ্যে কোনও প্রতিরোধ হচ্ছে না। এবং বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে, তাদের অনুষ্ঠানের মাধ্যমে একেবারে ঘরে ঘরে হিন্দি সিরিয়াল, পশ্চিমবঙ্গের  নিম্নমানের সিরিয়াল, যেগুলোতে ধর্ম, কুসংস্কার, কলহের কথা আছে- এগুলো সব ঢুকে পড়ছে। প্রতিরোধটা এখন আর নাই। তো এই প্রতিরোধটা না থাকা  খুবই- মর্মান্তিক। এটি দুটো জিনিস প্রমাণ করে একটা হচ্ছে আমাদের শাসকশ্রেণী আত্মসমর্পণ করেছে এদের কাছে। আরেকটা যেটা করে সেটি হলো আমাদের ভবিষ্যতটা খুব অন্ধকারাচ্ছন্ন মনে হয়।
 
এইযে আমাদের এখানে এখন ‘হে ফেস্টিভ্যাল’ হচ্ছে, এবং গুরুত্বপূর্ণ লোকেরাও বলছে, এমনকি বাংলা একাডেমীর লোকরাও বলছে যে একুশের মেলার চাইতেও এই মেলাটা নাকি অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তো  হে ফেস্টিভ্যালে যেই ছেলেমেয়েরা যায়,  ওখানে যে সকল  ইংরেজি বইপত্র পাওয়া যায় ওরা  তা সব  কেনে,  কোনও বাছবিচার করে না। এই যদি হয় অবস্থা তাহলে হবে যে পুঁথিসাহিত্য বলে একটা জিনিস ছিল না, আমাদের বাংলা পুঁথিসাহিত্য হয়ে যেতে পারে।  পুঁথিসাহিত্য হচ্ছে যারা  শিক্ষিত না, আধুনিক না, তারা পুঁথিতে লিখতো। তো আমাদের এখানেও যারা শিক্ষিত বা উচ্চশিক্ষিত বলে দাবিদার, যারা বিত্তবান তারা ইংরেজিতে লিখবে, ইংরেজি বই পড়বে। আর আমরা যারা বাংলা সাহিত্যের চর্চা করবো তাদের পরিস্থিতিটা হবে ওই যে ওরা যেমনটা বলতো যে ‘‘vernacular’।  ‘vernacular’  হচ্ছে যে  স্থানীয়দের ভাষা। তো আমাদের এটা স্থানীয় ভাষা হবে, বা এর মর্যাদা হয়তো ওর তুলনায় পুঁথিসাহিত্যের পর্যায়ে  চলে যাবে।
 
আবার যেটা আমরা দেখছি যেমন ধরো একুশে ফেব্রুয়ারী উদযাপনটা। এখন একুশে ফেব্রুয়ারী উদযাপনের জায়গাটাতে দুটো জিনিস ঘটছে। একটা হচ্ছে এই ফেব্রুয়ারী মাসেই একটা ভ্যালেন্টাইন ডে’ নিয়ে এসেছে, তো এই দিনটি  আবার ১৪  তারিখে (সাত দিন আগে)।  ফলে তরুণতরুণীদেরকে আগেই  একটা ভিন্ন  সংস্কৃতিতে নিয়ে যাচ্ছে। আবার আছে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। মাতৃভাষা দিবস মানে প্রত্যেকে তাদের নিজ নিজ  মাতৃভাষার চর্চা করবে। কিন্তু আমাদের তো এটা শহীদ দিবস। আমাদের তো এটা আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস না কিন্তু আমি এটা দেখি যে, তোমরাও দেখবে যে, আর্ন্তজাতিক মাতৃভাষা দিবস ও শহীদ দিবসকে নিয়ে দুটোকে একসাথে মিলিয়ে ফেলে- দুটোকে একসাথে মেলানোর একদম কোনও জায়গায়ই নাই। ঐতিহাসিকভাবে ঐ টা শহীদ দিবস, শহীদ দিবস হিসেবে উদযাপিত হবে।  
 
এখানে আরেকটা ব্যাপার দেখা যাচ্ছে যে শহীদ দিবস, মানে আমাদের এই  একুশে ফেব্রুয়ারীর  উদযাপন শুরু হতো সকালে, প্রভাত ফেরিতে, এটা হচ্ছে বাঙ্গালির নিজস্বতা। আমাদের  যে কোনও অনুষ্ঠান শুরু হয় সকালে সূর্যোদয়ের সাথে সাথে। এটাও  সূর্যোদয়ের সাথেই শুরু হতো। এখন এটাকে মধ্যরাতে নিয়ে গেছে। এই কাজটা শুরু হলো স্বাধীনতার পরে। স্বাধীনতার পরের প্রথম একুশে ফেব্রুয়ারী উদযাপনটাই মধ্যরাত্রে হল এবং মধ্যরাত্রে ওখানে নানা রকম বিশৃঙ্খলা হল, মেয়েরা  লাঞ্ছিত হল। এবং তারও পরে দাঁড়ালো যে, কে কার ছবি টানাতে পারে- মুজিবের না জিয়ার। কি অসুবিধা ছিল সকাল বেলায়ে এটি উদযাপন করায়? সকালবেলায়ই তো ছিল সবসময় । এবং এই উদযাপনের ক্ষেত্রেও দেখো পহেলা বৈশাখ আমরা সকালে আরম্ভ করি, আর ওরা করে থার্টিফার্স্ট নাইট, মানে রাত্রে।  আমাদের এখানেও  থার্টিফার্স্ট নাইটের মতই  টুয়েন্টিফার্স্ট ফেব্রুয়ারী ওই মধ্য রাত্রের উৎসবে পরিণত হচ্ছে। তো একুশে ফেব্রুয়ারীকে মধ্যরাত্রে  নিয়ে যাওয়াটাই কিন্তু আমাদের একটা পরাজয় বলে আমি মনে করি।  আরেকটা ব্যাপার হচ্ছে যে, এই থার্টিফার্স্ট নাইট এবং পহেলা বৈশাখের মধ্যে এখন একটা প্রতিযোগিতা চলছে, প্রতিদ্বন্দ্বিতা চলছে, এখন ভাগ হয়ে যাচ্ছে । যারা থার্টিফার্স্ট নাইট করে তারা আর পহেলা বৈশাখে করে না এবং থার্টিফার্স্ট নাইট এখন  বেশ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে কারণ এটা একদিকে বিত্তবানদের আরেকদিকে আন্তর্জাতিক।
 
আমরা তো, অনেকগুলো সাংস্কৃতিক কাজ করতে পারতাম এবং এটা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক কাজও। যেমন- আমাদের অর্থবছর। অর্থবছর একেক দেশে একেক সময়ে শুরু হয়। আমাদের অর্থবছর তো আমরা পহেলা বৈশাখে শুরু করতে পারতাম কিন্তু আমাদের অর্থ বছর ওইটা করলাম না। করলে আমাদের প্রকৃতির সাথেও মিলত। তো এইটা না করে আমরা এখন থার্টিফার্স্ট নাইট উদযাপন করি। এই হচ্ছে  পরাজয়ের লক্ষণ,  সব দিকে থেকেই।  এখন কথা হচ্ছে এসব দেখলে মনে হবে আমরা একটা প্রান্তিক দেশ। আমাদের তো জলাভূমি, ব-দ্বীপ ; মনে হবে যেন অভিশপ্ত একটা জনপদ। আমরা যেটা দেখছি, আমরা যেন পরাজিত হয়ে গেছি। আমরা যে এত দীর্ঘ সংগ্রাম করলাম, স্বাধীনতা আনলাম, কিন্তু পরাজিত হলাম কার কাছে? এখন বলা হয় যে পরাজিত হয়েছি কার কাছে এটা কেউ চিহ্নিত করতে পারি না। কেউ বলবে যে, পাকিস্তানের কাছে পরাজিত। মানে  পাকিস্তানী  ইসলামী আইডিওলজীর কাছে, আদর্শের কাছে ... হেনতেন। পাকিস্তান তো নিজেই নাই সে আবার কিভাবে পরাজিত করবে তাই না? আর পাকিস্তানীরা কি কোনও ইসলামী আদর্শে বিশ্বাস করতো? আর এই আদর্শে কোনও রাষ্ট্র কি এই পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হয়েছে? আমাদের এই এখানে মানুষ সবসময় ধর্ম নিরপেক্ষ, এইখানে কোনও ধর্মীয় দল কোনও গুরুত্ব পায় নি। পরাজিত হলাম কার কাছে তাহলে? আমরা পরাজিত হলাম ব্যবস্থার কাছে, রাষ্ট্র এবং সমাজব্যবস্থার কাছে। সেই ব্যবস্থাটা আমরা আনতে পারলাম না। তো রাষ্ট্র বদলালো, একবার সাতচল্লিশে, একবার একাত্তরে। বড় রাষ্ট্র ছোট রাষ্ট্র হল, কিন্তু রাষ্ট্রের ভিতরে যে স্বভাব-চরিত্র, সেটা কিন্তু বদলালো না । তার আইন-কানুন, বাহিনী, বিশেষ বাহিনী, সমস্ত আমলাতন্ত্র ... সমস্ত সামাজিক সম্পর্ক সব এক রয়ে গেছে । রাষ্ট্র আগের তুলনায় আরও নিষ্ঠুর হয়েছে। এতো নিষ্ঠুর কোনও রাষ্ট্র  আমরা আগে কখনও দেখিনি।
 
এই চল্লিশ বছরের ইতিহাস একদিকে বৈষয়িক উন্নতির ইতিহাস বলা যাবে, অনেক উন্নতি হয়েছে। অন্য দিকে অবনতির ইতিহাসও। কেবল নৈতিক ভাবে এ  অবনতি  লক্ষণ হোল  সহিংসতা। আরো বৈরিতা আছে। উৎপাদন বাড়ছে,  কিন্তু বিতরণ হচ্ছে না। উন্নতি যতো হচ্ছে ততোই বৈষম্য বাড়ছে। এবং এতো বড়, এতো বিপুল বৈষম্য আগে আমাদের ইতিহাসে কখনও ছিল না। কাজেই আমাদের যে স্বাধীনতার স্বপ্নটা ছিল, যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনার অনেক কথা বলা হয়, কিন্তু ব্যাখ্যা করতে গেলে বলা যায় না, আমরা বলতে পারি না যে আসলে চেতনাটা কি? তো আমার অভিজ্ঞতা বলছে যে মুক্তিযুদ্ধের চেতনাটা  ছিল একটা সমাজ বিপ্লবের চেতনা। যে সমাজটা একটা নতুন সমাজ হবে।রাষ্ট্রের চাইতে সমাজ অনেক বড়, অনেক পুরনো।  আমাদের এই সমাজে একটা বৈপ্লবিক পরিবর্তন দাঁড়বে।  আগের যে সম্পর্ক ছিল অর্থাৎ রাজা-প্রজার সম্পর্ক বলি অথবা ধনী-দরিদ্র্যের সম্পর্ক বলি, সেই সম্পর্কগুলো বদলে একটা মানবিক সম্পর্ক আসবে। সেখানে থাকবে অধিকার এবং সুযোগ, দুটোর একটা সাম্য।  অধিকারও থাকবে, সুযোগও থাকবে।। ওইটেই ছিল সেই চেতনা ।  মানুষ কিন্তু অংশ নিয়েছে ওরই জন্য। শুধু ওদেরকে তাড়াবে, পাকিস্তানিদেরকে, এ জন্য না। মানুষ চেয়েছিলো নতুন একটা সমাজ পাবে। সেই সমাজে  সাম্য প্রতিষ্ঠিত হবে। অধিকার এবং সুযোগের সাম্য। বরঞ্চ বৈষম্য বাড়ল। এবং সে বৈষম্য বাড়লো নানান কায়দায়। যেমন শিক্ষা দিয়েই এই বৈষম্য বাড়ানো হচ্ছে। শিক্ষার যে তিনটি স্রোত, তিনটা ধারা ,তা শ্রেণী বৈষম্যের উপরই প্রতিষ্ঠিত এবং এই শ্রেণী বৈষম্য কে আরও গভীর করছে। মানে  শিক্ষা যতো বাড়ছে ততো বৈষম্য বাড়ছে। এবং এই যে একটা হইচই - শিক্ষার মান নেমে গেছে, সেটা কেন হয়েছে আমরা ব্যাখ্যা করতে পারবো। সেটা আরেকটা বড় ব্যাপার । কিন্তু যারা ইংরেজি মাধ্যমে পড়ে তাদের কিন্তু কোনও অসুবিধা হচ্ছে না, তাদের প্রশ্নও ফাঁস হচ্ছে না, তাদের পরীক্ষাও বিলম্বিত হচ্ছে না । তাদের মেধা সম্বন্ধেও কেউ কোনও সন্দেহ করছে না বরং বলা হচ্ছে তাদের মেধা আন্তর্জাতিক মানের এবং আন্তর্জাতিক সার্টিফিকেটও আছে। কাজেই তাদের কোনও বিচলিত হবার কারণ নাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষায় কে পাশ করলো, কে ফেল করলো এইটা ইংরেজি মাধ্যমের ছেলেমেয়েদের চিন্তায় আসে না কারণ তারা আর ওইখানে যায় না, তারা এখানে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ছে আর বিদেশে যাওয়ার তালে আছে। আমাদের  মধ্যবিত্ত আর নিম্নমধ্যবিত্ত মানে গরিব মানুষদের যত প্রতিষ্ঠান সেগুলো ধ্বংস হয়ে যাবে, সেগুলো নানানরকম ভাবে নষ্ট হয়ে যাবে এবং এইগুলো সম্বন্ধে শাসকদের কোনও মাথা ব্যাথা নাই । তো এই জায়গাটাতে আমরা যদি যাই তাহলে আমরা দেখব যে পরাজিত হয়েছি আমরা এই ব্যবস্থার কাছে। ব্যবস্থাটা ভাঙতে পারি নাই, ব্যবস্থাটা ক্রমাগত আরও নিষ্ঠুর হচ্ছে।
 
আবার ধরো আজকে যে সম্প্রচার নীতি, এমন সম্প্রচার নীতি তো পাকিস্তান আমলেও ছিল না। পাকিস্তান আমলে জরুরী অবস্থা বা সামরিক শাসন হলে সম্প্রচার নীতি আসতো।  আজকে এই সম্প্রচার নীতির ফলে মানুষের মনে  মনস্তাত্ত্বিক ভাবে একটা চাপ পড়ছে।
 
আর আরেকটা জিনিস, খুব ছোট নিরিখে দেখা যাবে, যেমন ধরা যাক যে  আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে যে ছাত্র সংসদ আছে সেগুলিতে কোনো নির্বাচন হয় না দীর্ঘদিন। আমাদের সময় তো বটেই আমাদের আগে থেকেও খুবই জরুরী ছিল এইগুলো। প্রত্যেক বছর নির্বাচন হতো এবং নির্বাচনগুলোতে একটা উৎসব হতো। এই উৎসবের মধ্যে আমরা অংশ নিতাম, প্রত্যেকেই অংশ নিত। এবং মেধাবান ছেলেমেয়েরাই কিন্তু নির্বাচিত হতো । কোনও মেধাহীন ছেলে, যে ভাল ফল করে না, এরকম ছেলে প্রার্থীই হতে পারত না। কেননা তাকে ছেলে মেয়েরা নেবে না, তাকে ভোট দেবে না, তো যে দলই মনোনয়ন দেবে সে সবচেয়ে মেধাবান ছেলেগুলোকেই মনোনয়ন দিতো। তারা  লেখাপড়ায় ভালো, আবার তারা বক্তৃতায় ভালো,পাশাপাশি তারা সামাজিক হয়ে উঠছে কেননা তাদের ভোট চাইতে যেতে হয়। যে অভিনয় করে ভালো, যে ভালো খেলে, যে ভালো গান গায়, যে ভালো লেখে, আবৃত্তি করে, যারা সাংস্কৃতিকভাবে উজ্জ্বল, সেই ছেলেমেয়েরাই পরিচিত ছিল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে। তাদেরকে সকলে সমাদর করতো,  মানুষ মনে করতো যে এরাই আদর্শ ছেলে। তো এখন গুন্ডাপাণ্ডা, ছিনতাইকারী এ সমস্তদেরকেই দেখা যায়। এবং এই যে বাইশ বছর ধরে হবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র সংসদে নির্বাচন হয় নি, এটা ভাবাই যেত না আগে। প্রত্যেক বছর হত। আমরা তো মনে আছে যে আমি স্কুলে যখন, আমরা তো ঢাকাতেই বড় হয়েছি, আমরা  এই বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশেই থাকতাম, এই নির্বাচনগুলো  আমরা দেখতাম, কারা বক্তৃতা করে সুন্দর করে, কি প্রচার হচ্ছে, কিভাবে হচ্ছে, অভিষেক কিভাবে হয়। তখন  সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হত, ডিবেট হত, পত্রিকা বের হত বছরে বছরে। এখন বিশ্ববিদ্যালয়গুলো যে ছাত্র সংসদের ফি নেয়, যেমন ধরো-  বার্ষিকী বের করার একটা ফি নেয়া হয়, তো এই বার্ষিকী তো কখনো বের হয় না। আসলে এই ফি দিয়ে তেমন কোনো  ফলপ্রসূ  কাজ হয় না। তো আমরা এটা বলতে পারি যে এখন  বিশ্ববিদ্যালয়গুলো  শিক্ষিত তরুণদের ‘আধুনিক বস্তিতে’ পরিণত হয়েছে। বস্তিতে যেমন কলহ থাকে, কোলাহল থাকে, ঝগড়া বিবাদ থাকে, এটা-ওইটা  তুচ্ছ বিষয় নিয়ে খুনোখুনি হয় সে রকম বস্তির মত  হয়ে গেছে। আর এইখানে তো উন্নত চিন্তা বা উন্নত রুচি  বিকাশিত হচ্ছে না, সংস্কৃতি বিকশিত হচ্ছে না।  তো এইটা হচ্ছে একটা দৃষ্টান্ত, যেখানে আমরা বুঝতে পারি যে কিরকম অবস্থার ভিতর দিয়ে যাচ্ছে।
 
আমরা দেখতে পারি যে এখানে শিল্পের অনেক উন্নয়ন হচ্ছে, গার্মণ্টস্ এর অনেক উন্নতি হচ্ছে, কিন্তু গার্মেন্টস্ শ্রমিকদের ট্রেড ইউনয়ন নাই। তো ট্রেড ইউনয়ন তো একটা বেসিক বিষয়, একটি স্বীকৃতি, যেটি তাদের প্রথমিক একটি স্বীকৃতি। আরেকটা বিষয় যে আমাদের সম্পদ গুলো, আগে নিয়ে যেত জোর করে বা  এখানে বিনিয়োগ করে নানা কৌশলে নিয়ে যেতো, কিন্তু এখন আমরা দেখছি যে আমাদের লোকরাই ওগুলো পাচার করার তালে আছে, এবং আমাদের সমস্ত সম্পদ কি করে বিদেশিদের হাতে তুলে দেওয়া যায়, সেই চেষ্টাতেই আছে আমাদের শাসক শ্রেণী। আমাদের শাসক শ্রেণী  মনে করে যে এদেশের কোনো ভবিষ্যৎ নাই। কাজেই তারা এখান থেকে যত পারা যায় লুন্ঠন  করবে। তাদের ভবিষ্যৎ বিদেশে, তারা বিদেশে বাড়ীঘর তৈরী করবে। ছেলেমেয়েরা ইতিমধ্যেই বিদেশে চলে গেছে, আরো চলে যাবে। এবং আগের জমিদাররা যেমন কলকাতায় থাকতো, গ্রামে তাদের নায়েব-টায়েব যারা আছে তারা টাকা-পয়সা তুলতো। আর জমিদাররা ঈদ –পূজায় এসে একটু হৈচৈ করে, টাকা-পয়সা নিয়ে  আবার কলকাতায়  চলে যেত। তো আমাদের এখানেও  এখন যারা আছে, তারা আছে সংগ্রহের জন্য। আমি শুনি যে, যারা বড় বড়  গার্মেন্টস শিল্পের মালিক তাদের ছেলেমেয়েরা বিদেশে থাকে, বাড়ীঘরও সেখানে। এখানে চালাচ্ছে, টাকা পয়সা সংগ্রহ করছে, আবার চলে যাবে। আবার যত তেল-গ্যাস, খনিজ সম্পদ যেগুলো অনুসন্ধান হয়, এই যে উন্মুক্ত কয়লার খনি করার পরিকল্পনা সমস্ত গুলোই বিদেশীদের স্বার্থে। দেশি লোক বিদেশিদের স্বার্থ দেখছে। এবং কোনও গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান কাজ করছে না, কাজেই এইগুলো সবই প্রমাণ করে যে আমরা পরাজিত হয়ে গেছি এই ব্যবস্থার কাছে, এই একটা ভয়ংকর খারাপ ব্যবস্থা, আগেও খারাপ ছিল, এখন আরো খারাপ হয়েছে। আমরা যাতে প্রতিরোধ না করতে পারি তার সমস্ত ব্যবস্থাই  সাংস্কৃতিকভাবে চলছে।  সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও তো আজকে আমাদের কোনো প্রতিরোধ নাই, তেমন কোনো নাটক পাইনা, কোনো প্রতিবাদী গান পাই না, সেরকম উদ্দীপনমূলক কোনো অনুষ্ঠানও হয় না।(চলবে...)