ছোট গল্পঃ সরভানুর পতাকা যুদ্ধ

শিল্প ও সাহিত্য: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ১৪ এপ্রিল ২০১৭, ০২:০৯ পূর্বাহ্ন
sarvanu

কালো ছিপছিপে, লম্বা একহারা গড়নের বেটি মানুষ সরভানু। বাহির থেকে দেখলে চককেশব গাঁয়ের সবার চেয়ে আলাদা মনে হয় তাকে। বিল ও নদীর মোহনায় গড়ে ওঠা এই গাঁয়ের উত্তর-পূর্ব কোণে বালুচরের বাসিন্দা সরভানু। মাঝ বয়স পার করে জীবন ও জীবিকার অযুত বৈপরীত‌্যরে মাঝে টিকে থাকা সরভানুর ধারণা-
"ছাওয়াল পয়দা করাডা যেই-সেই কাম লয় বু! এড্যা মিয়া মাইনষের জীবনে এক রুকমের যুদ্ধ।"

লহরী ও সরভানুর বিবাহত্তোর জীবনের এক যুগ পূরণের প্রান্তে।  নানান ঔষধ, কবিরাজ, তাবিজ-তুম্বা ও পানিপড়াসহ অনেক কাঠখড় পোড়ানোর পর একটি সন্তানের মুখ দেখার সৌভাগ‌্য হলেও অবশেষে তাও বাঁচেনি। এখন তার খাঁ খাঁ বুকটাকে মা' বলে ডেকে একটু জুড়নোর কেউ নেই। কি দোষে, কি ভুলে আল্লাহয় জানে; আর কোনদিন, কোনভাবেই মা হওয়ার সম্ভাবনা বাঁকি থাকে না সরভানুর। সবাই বলে- কালাজ্বরই নাকি ওর সন্তানের প্রাণনাশের কারণ। বিকালের অবসরে  পাড়ায় বেড়াতে বের হওয়া বিভিন্ন বয়সের মহিলাদের প্রায়শই বলতে শুনেছে সরভানু- ''কুটেবা, কিব‌্যা দুষ হোচে রি সরভানু, তুর। আর তা না হলে তুর কপালই খারাপ।''

গল্পে গল্পে মাঝে মাঝেই এইসব কথা প্রতিবেশীদের মুখে শুনলে হু হু করে ওঠে সরভানুর ভিতরটা। কিন্তু তাতে কি? জগত সংসারের কোন অশুভ ছায়াই তার দুচোখে আঁধার নামাতে পারেনি। এইসব অশুভ ভাবনার বিকল্প হিসেবে মাদারের গানের দলের সাথে কিচ্ছা-গান গেয়ে  জেলায় জেলায় ঘুরে বেড়ায় স্বামী লহরী ছোকরার সাথে।

সরভানুর বাবা ছিলো হাঁপের রোগী। কখন কি হয়ে যায়- এই ভয়ে অল্প বয়সে বাবা তার একমাত্র মেয়ে সরভানুকে বিয়ে দিয়েছিল গানের দলের ছোকরা লহরীর সাথে। দবীজ দেহের লহরী ছোকরার বিশ্বাস- মাত্র ক'দিনের দুনিয়ায় কোনকিছু নিয়ে মন খারাপ করা যাবে না। জীবন যেহেতু একটাই, ফলে এখানে যে'কদিন বেঁচে থাকা যায়, যুদ্ধ করে যেতে হবে মানুষকে। কিন্তু সরভানুর মন তো মানে না। সে হয়ত বিশ্বাস করতে চায়- লহরীর সংসারে এসে সে যুদ্ধ করেছে ঠিকই কিন্তু পতাকা এখনো তার নিজের হাতে পায়নি। তাই পতাকার বদলে এখন তার শূন‌্য দু'হাতে তুলে  নিয়েছে পুরাতন শাড়ির পরিস্কার ছেঁড়া অংশ আর বিশুদ্ধ গরম পানি। রাত-বিরাত যখন হোক, যতো দূরগ্রামে হোক না কেন, যে কোন প্রসূতি মায়ের পেটের ব্যথা উঠলেই সরভানু ছুটে গিয়ে হাজির হয় সেখানে। গন্তব‌্যে পৌঁছাতে নেমে পড়ে সন্তান খালাসের যুদ্ধে। নিজের জীবনে অক্টোপাসের মতো আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে থাকা কষ্টের কথা অন্তরে লালন করতে করতে কবে যেন পাক্কা দাইমা হয়ে উঠেছে সরভানু; নিজে বলতেও পারবে না। একেকটা সন্তান সফলভাবে খালাশ করাতে পারলে নবজাতকের পরিবারের লোকজন পরম যত্ন ও বিনয়ের সাথে কমসেকম দুইশ টাকা গুঁজে দেয় সরভানুর শাড়ির আঁচলে। সাথে থাকে একটা নতুন শাড়ি, গহনা, চাউল, তরিতরকারী আরো কত কী। নিজেকে সম্মনিত বোধ করে সরভানু। ভাল লাগে ওর। সারামনে অদ্ভুত এক মুক্তির আনন্দ- এ যেন ভরাডুবির জগত সংসারে সরভানুর জীবনকে ভালবেসে বেঁচে থাকা মুষ্ঠিলাভ। ভেতরে ভেতরে বুঝতে পারলেও এহেন ভাললাগার তরজমা সরভানুর জানা নেই। তার মনে হয়- এ যেন এক শিরোনামহীন মুক্তি। যার অনুপম আনন্দে অন্তত বেঁচে থাকা  যায় অনন্তকাল।

সাহাপাড়ার ভেতর দিয়ে উত্তর-দক্ষিন বরাবর বয়ে গেছে বেলে দোঁ-আঁশ মাটির সরু পথ। পথের দু'ধার ঘেষা বিস্তৃত ভূঁইয়ে উপচে পড়া চৈতালী ফসলের দৃষ্টি জুড়ানো সবুজ। জমির আইলের দুপাশ ঘেষে মালিকানাবিহীন উপচে পড়া লকলকে কচুগাছ। সেখান থেকে সবুজ কচিপাতা তুলে জমির আইলের ওপর রাখা টুকরিতে জমা করছিল সরভানু আর আনমনে মিষ্টি সুরে গুনগুন করে গাইছিল-

'কালাই তুলব‌্যার গেচুনু হামি শিবনদীর ধারেতে;

ও আমার- অঞ্চলেতে ঝুলচে কালাই রে।'

এমন সময় দক্ষিন দিকে কিছুটা হেলে পড়া সূর্যের তির্যক ছায়া এসে সরভানুকে ঘিরে ধরে। ঘাড় ঘুরাতেই সরভানু দেখে- ওর পাশে এসে দক্ষিন পাড়ার নজর মোল্লা দাঁড়িয়ে আছে। কারো কানে যেন না পৌঁছায় ঠিক তেমন করে, অনেকটা মাপা স্বরে, মাথা ঝুঁকিয়ে কি যেন আকথা-কুকথা বলে ফেলে সরভানুকে। জবাবে সরভানু কচু কাটা রাম'দা নজর মোল্লার দিকে  তাক করে বলে-
"এড্যা কি দেকিচু, ক্যারে জ্যাওরা!''
সরভানুর ডানহাতে ছিল রাম'দা। সেটি উঁচিয়ে দৌড়াতে থাকে নজর মোল্লার পেছন পেছনে। মুহুর্তেই পাড়ার ভিতরে অসংখ‌্য গাছ গাছালীর ভিতর অদৃশ‌্য হয়ে যায় নজর। '৭১ এ মুক্তি বাহিনীতে নিজেদের সন্তানদের কোন রকমের সহযোগিতা না করে নজর মোল্লা পাকবাহিনীর ক্যাম্পে গ্রামের লকলকে বেটিদের সাপ্লাই দিতো। দেশ স্বাধীনের পর নাকি গ্রামের সবাই ফিসফিস করে বলাবলি করত- "কে না জানে, পালাপালির সময় এডাই আচলো নজরের কাজ।"

উত্তরপাড়ার মফর আলি। সরভানুর দুর সম্পর্কের আত্মীয় ভাই। নামকরা দাইবোন সরভানুকে তার সাথে বাড়ি নিয়ে যাবে বলে সেই পথে জমির আইলের ওপর দিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে ছুটে আসছিল মফর। সরভানুকে পাগলের মতো ছুটতে দেখে মফর আলি জমির আইল ছেড়ে ইরি ধানের ক্ষেতের ভেতর হাঁটু পর্যন্ত কাদা মেখে হাত বাড়িয়ে বাধা হয়ে দাঁড়ায়। দৌড়ে এসে হাঁসফাঁস করতে থাকা মফর সরভানুকে বলে- ''মুক্তির মা'র প‌্যাটের ব্যাদনা উটিচে, তুক একন-ই যাওয়া ল্যাগবে রে ভানো। দেরি করিস না, একনই হামার সাতে চলেক তো!

মফর আলির কথাগুলো কানে ঢোকার সাথে সাথে মাথার মধ্যে ঝিলিক মারে সরভানুর। এতক্ষনে বড় বড় দুইখান বেরিয়ে আসা চোখ ক্রমশ ছোট হয়ে নিমেশে কুটরীর ভিতরে ঢুকে যায়। সরভানুর চোখের দিকে তাকিয়ে আশ্বস্ত হয় মফর আলী। সরভানুকে নিরুত্তর আর নির্লিপ্ত দাঁড়িয়ে  থাকতে দেখে ওর বাম হাত থেকে রামদাটা  সাবধানে নিজের হাতে পার করে নেয় মফর। এবার ওটার বাঁট দিয়ে নিজের কপালের ঘাম মুছে নেয় মফর আলি। সরভানুর দিকে অপলক তাকিয়ে থেকে আবারও চাপা গলায় বলে-
"চল ভানো, ছাওয়ালডার মুকের দিকে তাক্যায়া দ্যাকার পর এই রাম'দা লিয়্যা যামু পাক বাহিনীর ক্যাম্পত। তুর সাথে হামিও যুদ্ধেত যামু রে ভানো, একন অন‌্য কিছু ভাবার টাইম নাই। একন যুদ্ধের ভিতরে আর এক যুদ্ধ হচে। চলেক তো, সময়ের যুদ্ধ সময়ে করবার পারলে  দ‌্যাশ একদিন  স্বাধীন হোবেই।''

মফর আলির কথাগুলো সরভানুর কানের ভিতরে ঢুকে একদম মগজের ভিতর স্থায়ীভাবে জায়গা করে নেয়। মফরের সবগুলো কথা বিশ্বাস হয় সরভানুর। নিমেষেই একে অপরের চোখে চোখ পড়ে। দুরন্ত বিশ্বাসের ফুলকি খেলে যায় সরভানুর দুচোখের সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। মফর আলির বাঁ ভ্রু'র  ওপর সনাক্তকরণ চিহ্ন- গোখরা সাপের মতো কাটা দাগটায় বিদ্যুৎ খেলে যেতে দেখে সরভানু। কাল বিলম্ব না করে আলুথালু শাড়ির আঁচল এক ঝটকায় মাজায় জড়িয়ে বলগা হরিনের মতো ঝাঁপ দিয়ে বেরিয়ে পড়ে সরভানু- আজও হাতে না পাওয়া পতাকা যুদ্ধে। সঙ্গি হয় মফর আলি।

লেখকঃ

আহমেদ আহসান হাবিব

সহকারী অধ্যাপক
অর্থনীতি বিভাগ
ঢাকা কমার্স কলেজ, ঢাকা