জাগর আলীর অর্থনীতি

শিল্প ও সাহিত্য: পোস্টকার্ড | প্রকাশিত: ২১ মে ২০১৭, ০১:৪৬ পূর্বাহ্ন
jagor-ali

জাগর আলী। রাজধানী শহরে একজন সিএনজি চালক। লেগুনার হেলপার থেকে এখন সিএনজি ড্রাইভার। থাকে দক্ষিন বিশিল, মিরপুর। একটি মেস বাড়িতে। এলাকার শেষ মাথায় ধান ক্ষেতের কাছাকাছি একটা টিনশেড বাড়িতে। যখন ইচ্ছা বাসায় ফেরা যায়। রাত বিরাতে বাসায় ফেরার বাধা ধরা কোন নিয়ম নেই।

জাগর আলীর পুরা সপ্তাহ কাটে টাইট সিডিউলে। তবে শুক্রবার  দিনটি সম্পূর্ণ শুয়ে বসে অবসরের মাঝে কাটায় সে। ঢাকায় এসে প্রথম কয়েক বছর খুব কষ্ট করেছে সে। কঠোর পরিশ্রমের সেই দিনগুলোকে স্মরণ করে সাপ্তাহিক ছুটির এদিনটিতে নিজের সাথে- না কথা বলে কাটায় সে। বিলাসিতা বলতে এই এতটুকু। এছাড়া একদম সাদামাটা জীবন যাপন তার। সপ্তাহের অন্যান্য দিনগুলোতে নিশ্ছিদ্র ব্যস্ততায় কাটলেও শুক্রবারে   এনিয়মের কোন ব্যত্যয় হয় না জাগর আলীর।

এই মেসবাড়িটি উত্তর বঙ্গের লোকজনে ঠাসা। যমুনা সেতু পার করে একাধারে পাবনা, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া, গাইবান্ধা, দিনাজপুর, পার্বতীপুর, সৈয়দপুর, নিলফামারী, নাগেশ্বরী ও কুড়িগ্রামসহ দেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চল থেকে আসা লোকজনের প্রথম ঠিকানা এই মেসটি। ড্রাইভার হিসাবে সাধারনত গাড়ি চালিয়ে জীবন ধারণের উদ্দেশ্যে যারা রাজধানী   শহরে আসে তাদের সকলেই জটলা পাকায় এই মেসে। তবে মেস-বাড়িতে যারা এখন আছে তাদের প্রায় সবাই এশহরের  বিভিন্ন রুটে ছড়িয়ে ছিটিয়ে সিএনজি চালায়। এমন দুই একজন আছে যারা এখন লেগুনা চালাচ্ছে।

প্রতিদিনের মতো ঘুম থেকে জেগে, অদ্ভুতভাবে বেঁচে থাকা বিগত চব্বিশ ঘন্টার জন্য সিটরেন্ট বা সিটভাড়া বাবদ পঞ্চাশ  টাকা গুণে, তবেই দিন শুরু করতে হয় জাগরকে। এরপর  সকালের নাস্তা, দুপুর ও রাতের খাবারসহ কমবেশি আরো  তিন'শ টাকার খরচ তো আছেই। সারাদিনের জন্য বোতলজাত বিশুদ্ধ দুই লিটার পানি, চা-পান-তামাকসহ আরো প্রায় এক'শ টাকার খরচ থেকে বাঁচার কোন সুযোগ নেই।

ফুয়েল বা জ্বালানীর প্রসঙ্গ উঠতেই আরো চার'শ টাকার হিসাব-  মোট খরচের সাথে যোগ হল। দিনশেষে মালিককে জমা দিতে হয় আরো এক হাজার টাকা। কথার ফাঁকে গল্পে গল্পে এই বিষয়গুলো জানা হল জাগরের কাছ থেকে। কারণ রাজধানী শহর বলে কথা- মোটামুটি মাপের এই রকম একটা জ্যামে আটকা পড়লে নির্বিকার বসে না থেকে এতটুকু কথা-বার্তা একজন সিএনজি চালকের সাথে বলা যেতেই পারে। নাই কাজ তাই খই ভাজ টাইপের বিষয় আর কি!

এতক্ষনে গন্তব্যে পৌঁছে গেলাম।সিএনজি থেকে নেমে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম-
ও সিএনজি ওয়ালা ভাই,
তুমি তো বেশ সুন্দর করে জমা খরচের হিসাব রাখতে পারো!
জবাবে সে বলল-
কি করব ভাই;
হিসাব না করলে কি চলে?
বউ-বাচ্চা মানে, সংসার আছে না!
-বলেই লাজুক ভঙ্গিমায় একটা মুচকি হাসি বেশ স্বার্থকভাবে আড়াল করে নেয় জাগর আলী। তাকে বেশ রোমান্টিক মনে হল। তবে আমাকে বুঝে উঠতে না দিয়ে হুট করে গম্ভীর হয়ে গেল সে। একটা দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলে বলল,
-প্যাট তো শুধু আর একার না ভাই, অনেকগুলান। সেক্ষেত্রে  সংসারের সকলের প্যাট  তো আমার কাছে সমান গুরুত্বের। ওর কথাগুলো ভাল লাগছিল। মনযোগ দিয়ে শুনছিলাম আর ভাবছিলাম-
তাই তো, সংসারে থেকে যেমন বৈরাগী হওয়া যায় না, তেমনি বৈরাগ্য বর্জন করে একবার সংসারী হলে, শক্ত হাতে সংসারের  হাল মুঠোয় ধরলে নিজের প্রয়োজনের চেয়ে পরিবারের প্রয়োজনের গুরুত্বই তখন বেশি হয়ে দেখা দেয়।

এবার তার চোখে আমার চোখ পড়ল। আমি মাথা ঝাঁকিয়ে তার কথাগুলোকে সায় দিয়ে যাচ্ছিলাম বলে জাগর আলী আশ্বস্ত হচ্ছিল। ওর বলা কথাগুলোর মধ্যে আত্মবিশ্বাস ক্রমেই  বাড়ছিল।
এবার তার চোখের দিকে চেয়ে জিজ্ঞেস করলাম-
আচ্ছা ভাই-
সারাদিনে সর্বনিম্ন কত টাকার ভাড়া মারো তুমি?
কিছুক্ষন ভেবে নিয়ে সে জানাল
-এই ধরেন পঁচিশ'শ।
তা সর্বোচ্চ হলে কত হয়? আবার জিজ্ঞাসা করলাম।
- আল্লাহ যদি চায় আর শরীর যদি ভাল থাকে তবে তিন, সাড়ে তিন হাজারের মতো তো হয়ই!
- এই বলেই জাগর আলী তার সিএনজির এক্সিলেটরে চাপ দেয়।
সিএনজি স্টার্ট নিয়ে নিলো। নিজের শরীরে একটা ঝাঁকুনী অনুভব করলাম। কিন্তু নিমিষেই পায়ের নিচের মাটিতে বিলীন  হয়ে গেলো। মনে হলো, দিনদিন মানুষের ভেতরে স্বাবলম্বী হয়ে  ওঠার পাশাপাশি স্বচ্ছ জমা-খরচ রাখার একটা ভাব ক্রমশ ছড়িয়ে পড়ছে।
কথায় বলে- পিঠা খেলে ফোঁড় গুনতে হয়। এটা অবশ্যই এক  ধরনের সামাজিক সচেতনতার বহিঃপ্রকাশ।

কাজের মানুষ বলে কথা, ওর সময় আর নিতে না চেয়েও শেষবার তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে জিজ্ঞাসা করলাম,
- দিনশেষে গড়-পড়তা শ'পাঁচেক টাকা নিয়ে বাসায় ফিরতে পারো তো নাকি?
নির্লিপ্ত ভঙ্গিমায় ঠোঁটে তৃপ্তির হাসি মাখিয়ে মাথা নড়িয়ে বলল- তা হয়।
আমি বললাম- তোমার সাথে কথা বলে ভাল লাগল। সে খুশি হলো।

নিমেষেই দৃষ্টির আড়ালে চলে যায় জাগর আলীর সিএনজি, সাথে জাগর আলীও। জাগর আলীর মুখমন্ডল আমার মনের চোখে ক্রমেই অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আমি আরো কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থাকলাম। চেয়ে থাকলাম- যতক্ষনে দৃষ্টির আড়াল না হয়ে গেলো।কিন্তু ওর কথাগুলো কানে এখনো লেগে আছে।

 

লেখকঃ

আহমেদ আহসান হাবিব

সহকারী অধ্যাপক
অর্থনীতি বিভাগ
ঢাকা কমার্স কলেজ, ঢাকা